
গুরুতর অসুস্থ হয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। টানা পাঁচ দিন করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন তিনি। তবে ঝুঁকিমুক্ত নন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। দল থেকে বলা হচ্ছে, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সমন্বয়ে আগের মতোই তার চিকিৎসা চলছে।
হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের সূত্র থেকে জানা যায়, রোববার রাতে খালেদা জিয়াকে অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তার শারীরিক অবস্থা তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। ‘সতর্কতা’ হিসাবে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়াও ইতোমধ্যে আইসিইউ-এর কিছু সাপোর্ট সিসিইউতেই সরবরাহ করা হয়েছে। বিদেশে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই বলেও জানা যায়। এদিকে সোমবার দুপুরে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সহায়তায় চীনের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসেছে। বিএনপির চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা করে তারা সন্ধ্যায় দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গতকালও বেশকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেওয়া হয়েছে। আজ চীন থেকে সাতজনের আরেকটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল ঢাকায় আসার পর পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করার কথা রয়েছে।
সোমবার দুপুরে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানিয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তার চিকিৎসা চলছে বলেও জানান তিনি। মির্জা ফখরুল বলেন, খালেদা জিয়া এখন অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছেন। চিকিৎসকরা কাজ করছেন। আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে তার চিকিৎসা চলছে। সারা দেশের মানুষ খালেদা জিয়ার রোগমুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া চাইছেন। আল্লাহ যেন তাকে দ্রুত সুস্থ করে দেন, দেশের জন্য কাজ করার সুযোগ দেন।
২৩ নভেম্বর ফুসফুসে সংক্রমণ থেকে শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন খালেদা জিয়া। লন্ডনে অবস্থানরত ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও পরিবারের সদস্যরা প্রতিনিয়ত খোঁজখবর নিচ্ছেন।
সোমবার রাতে খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রোববারের তুলনায় সোমবার খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। কিডনি ডায়ালাইসিস হয়েছে। তবে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়নি। সতর্কতা হিসাবে আইসিইউ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এই আইসিইউ সাধারণ আইসিইউর মতো নয়। এখানে সব ধরনের সাপোর্ট রয়েছে। তবে মেডিকেল বোর্ড এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। খালেদা জিয়াকে আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।’
সোমবার সন্ধ্যায় মেডিকেল বোর্ডের অন্য একজন সদস্য জানান, চীনসহ আরও দুই-তিনটি দেশ থেকে আসা কয়েকজন চিকিৎসক খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ফলোআপ করেন। এরপর তারা মেডিকেল বোর্ডের বৈঠকে অংশ নেন; যেখানে যুক্ত হন দেশি-বিদেশি অন্তত দেড় ডজন চিকিৎসক। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস হসপিটাল ও লন্ডন ক্লিনিকের চিকিৎসকও আছেন। এছাড়া লন্ডন থেকে খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান ও পুত্রবধূ ডা. জোবাইদা রহমানও অংশ নেন। দুই ঘণ্টাব্যাপী বোর্ডের বৈঠক হয়। সেখান খালেদা জিয়ার চিকিৎসার পরবর্তী করণীয় বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে এখন পর্যন্ত শারীরিক অবস্থা ভালো বলা যাবে না, আবার একেবারে খারাপ, তাও বলা যাবে না। মেডিকেল বোর্ড নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখছে।
জানা যায়, হাসপাতালে বিএনপির চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান, ছোট পুত্রবধূ সৈয়দা শর্মিলা রহমান, ভাই শামীম ইস্কান্দার ও তার সহধর্মিণী কানিজ ফাতিমা সার্বক্ষণিক থাকছেন। এছাড়া গৃহপরিচারিকা ফাতেমা ও স্টাফ রূপা আক্তার খালেদা জিয়ার সঙ্গে আছেন।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘এভারকেয়ার হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে আগের মতোই ম্যাডামের চিকিসা চলছে। দয়া করে যে যাই বলুক, এ ব্যাপারে কারও কথায় কেউ বিভ্রান্ত হবেন না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সার্বক্ষণিক ম্যাডামের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত আছেন। তাদের থেকে যতটুকু জানতে পেরেছি, তার চিকিৎসা চলছে, এটাই আপডেট।’
এছাড়া খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার আপডেট বিষয়ে ব্যক্তিগত চিকিৎসক এজেডএম জাহিদ হোসেনের বক্তব্য ছাড়া অন্য কারও বক্তব্য গ্রহণ না করার আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি।
চীনা চিকিৎসক প্রতিনিধিদল ঢাকায় : বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় সহায়তার জন্য পাঁচ সদস্যের চীনা চিকিৎসক প্রতিনিধিদল এভারকেয়ার হাসপাতালে পৌঁছেছে। সোমবার দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে তারা হাসপাতালে প্রবেশ করেন। খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এজেডএম জাহিদ হোসেন তাদের রিসিভ করেন। চীন থেকে আজ আরেকটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। জানা যায়, তারা আসার পর দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবেন।
হাসপাতালের সামনে নেতাকর্মীদের ভিড় : এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে ভিড় করতে নিষেধ করা হলেও দলীয় নেতাকর্মীদের ঠেকাতে পারছে না বিএনপি। পাশাপাশি সাধারণ জনগণও খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা জানতে হাসপাতালসংলগ্ন এলাকায় ভিড় করছেন। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা হাসপাতালে গিয়ে বিএনপির চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিচ্ছেন। নেতাকর্মীদের ভিড় সামলাতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
সোমবারও সারা দেশে দোয়া-মোনাজাত : সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তি ও সুস্থতা কামনা করে সোমবারও রাজধানীসহ সারা দেশে দোয়া-মোনাজাত করেছে বিএনপি। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করে দোয়া করে।
এদিন দুপুরে মোহাম্মদপুরে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠানে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির নেত্রী নন, তিনি শুধু বিএনপির অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের নেত্রীও নন। আজ সারা দেশের সব মানুষ তার জন্য দোয়া করছেন। সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ঘিরে গোটা জাতি আজ এক বেদনাবিধুর অবস্থার মধ্যে রয়েছে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তি কামনায় দোয়া মাহফিল করেছে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) ও বাংলাদেশের ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)। এ সময় বিএফইউজের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. ওবায়দুর রহমান শাহীন, মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া, ডিইউজের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলমসহ নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। রাজধানী শ্যামলী-আদাবরে এতিমখানায় পবিত্র কুরআন খতম এবং এতিম বাচ্চাদের নিয়ে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্মসাধারণ সম্পাদক সালেহ মো. আদনান। ছোট ছোট শিশু কান্নাজড়িত কণ্ঠে খালেদা জিয়ার আশু সুস্থতা কামনা করেন। বিকালে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থের উদ্যোগে বারিধারা এলাকায় দোয়া ও মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এছাড়া গুলশান আজাদ মসজিদে জোহরের নামাজ শেষে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
খালেদা জিয়াকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা-পাচ্ছেন এসএসএফ নিরাপত্তা : বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করেছে সরকার। একই সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে সোমবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সরকার, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) আইন, ২০২১-এর ধারা ২(ক)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসাবে ঘোষণা করা হলো। অবিলম্বে এই আদেশ কার্যকর হবে। এদিকে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা ও রোগের কারণে কয়েক দিন ধরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে।
সংবাদটি পঠিত হয়েছেঃ ৯২