
নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল :: বরিশালে এখন শুধু দক্ষিণাঞ্চলের একটি বাণিজ্যিক নগরী নয়, এটি ক্রমেই পরিণত হচ্ছে অপরাধের নিরাপদ ট্রানজিট পয়েন্টে।
বিশেষ করে মৎস্য খাতকে ঘিরে যে অবৈধ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, তা শুধু পরিবেশ বা অর্থনীতির জন্য নয়, আইনশৃঙ্খলা ও মানব নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠছে।
এই নেটওয়ার্কের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এর মুখোশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে সাংবাদিকতার পরিচয়।
বরিশালে বর্তমানে অন্তত বিভিন্ন ধরনের তথাকথিত সাংবাদিক সক্রিয়,যাদের স্থানীয়ভাবে মাছ, ড্রেজার, বিট মানি, হ্যানি ট্যাপ, আ’লীগ নেতাদের শেল্টার দেওয়াসহ আটক সাংবাদিক নামে চিহ্নিত করা হয়।
এদের কাজের ধরন আলাদা হলেও লক্ষ্য একটাই—নিষিদ্ধ মাছকে কেন্দ্র করে অবৈধ অর্থ উপার্জন। এক শ্রেণির মাছ বিট সাংবাদিক নিয়মিত টাকার বিনিময়ে নিষিদ্ধ মাছ নির্বিঘ্নে পার করে দিচ্ছে। এই তালিকায় রয়েছে জাটকা ইলিশ, চাবলি, ছোট রেনু পোনা, ছোট গলদা ও বাগদা চিংড়ি এবং ছোট ভাঁটা মাছ। এসব মাছ আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বা নিষিদ্ধ হলেও দক্ষিণ অঞ্চলের নদী ও উপকূলীয় এলাকা থেকে সেগুলো বরিশাল হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে। এর পেছনে কোনো গোপন কৌশল নেই, আছে শুধু বিট মানির লেনদেন। নির্দিষ্ট অঙ্কের বিকাশের মাধ্যমে টাকা দিলেই সব বাধা অদৃশ্য হয়ে যায়।
এই বিট সাংবাদিকরা আগেভাগেই জানিয়ে দেয় কোন রুট নিরাপদ, কোন সময় তল্লাশি নেই, কোথায় প্রশাসনের নজর দুর্বল। ফলে মাছবাহী ট্রাক বা নৌযান নির্বিঘ্নে শহর অতিক্রম করে। এতে একদিকে যেমন সরকারি জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচি ভেস্তে যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের মৎস্য সম্পদ ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে আরও ভয়ংকর রূপে সক্রিয় আটক সাংবাদিকরা। তারা একই নিষিদ্ধ মাছ রাস্তায় আটক করে। কখনো নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় বা পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে, কখনো প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে। কিন্তু এসব মাছ কোনো থানায় বা মৎস্য অফিসে জমা পড়ে না। আটক নাটকের আড়ালে চলে প্রকাশ্য ছিনতাই। মাছ ছাড়াতে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়, অথবা মাছ সরাসরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেওয়া হয়।
এই দুই পক্ষের সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ ব্যবসায়ী, জেলে ও পরিবহন শ্রমিকরা। একদিকে বিট মানি না দিলে মাছ পার করা যায় না, অন্যদিকে পার করলেও পথে আটক নাটকের শিকার হতে হয়।
বরিশাল মেট্রোপলিটন নগরে পুরো প্রক্রিয়াটিই একটি সুসংগঠিত অপরাধ ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন হলো,এই অপরাধ এত প্রকাশ্যে চলছে কীভাবে,,? বরিশালে সন্ধ্যার পরে বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে তথাকথিত সাংবাদিকদের নিয়মিত আড্ডা,চায়ের টেবিলে গল্প এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক জনমনে গভীর সন্দেহ তৈরি করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য ও প্রশাসনের একাংশের নীরবতা বা সহযোগিতা ছাড়া এই সিন্ডিকেট টিকে থাকা সম্ভব নয়।
এই দায়মুক্তির সংস্কৃতিই অপরাধীদের ক্রমেই আরও বেপরোয়া করে তুলছে। এর পরিণতি ইতোমধ্যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অপরাধী চক্র জানে, তাদের বিরুদ্ধে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। হানি ট্র্যাপসহ বিভিন্ন অপরাধী নেটওয়ার্ক আগেই ভাঙা হলে হয়তো পরিস্থিতি এত দূর গড়াত না।
আজ মাছের নামে চাঁদাবাজি, কাল সাংবাদিকতার নামে ছিনতাই, পরশু হয়তো আরও বড় কোনো সহিংসতা—এই ধারাবাহিকতা চলতেই থাকবে যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়। বরিশাল শহর আরেকটি বড় দুর্ঘটনার দিকে এগোচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন আর অমূলক নয়।
প্রশাসনের কাছে এখন সময় এসেছে কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ার। কে বিট সাংবাদিক, কে আটক সাংবাদিক, কে প্রকৃত সাংবাদিক আর কে অপরাধী—এই পার্থক্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। জাটকা ইলিশ, রেনু পোনা, ছোট গলদা-বাগদা ও ভাঁটা মাছের অবৈধ পরিবহনকে কেন্দ্র করে যারা সাংবাদিকতার পরিচয়ে অপরাধ করছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং কিছু পুলিশ প্রশাসনের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। তথাকথিত কিছু সাংবাদিককেও লালিতপালিত করে রেখেছে কিছু পুলিশ সদস্যরা।
এটি শুধু মৎস্য সম্পদ রক্ষার প্রশ্ন নয়, এটি বরিশালের আইনশৃঙ্খলা,নাগরিক নিরাপত্তা এবং সত্যিকারের সাংবাদিকতার অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। এখনই ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনে আরও সহিংসতা এবং ভয়ংকর বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
সংবাদটি পঠিত হয়েছেঃ ২২৫