
নিজস্ব প্রতিবেদক:: দিনের বেলায় সুনসান নীরবতা, সন্ধ্যা গড়িয়ে একটু অন্ধকার হলেই শুরু হয় বালু উত্তোলনের বিশাল কর্মযজ্ঞ। গণমাধ্যমকর্মীদের চোখ ফাঁকি দিতে দিনের আলোর বদলে রাতের অন্ধকারকে বেছে নিয়েছে বালুখোকোরা। স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কতিপয় নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বালু উত্তোলন হওয়ায় প্রশাসনের ভূমিকাও রহস্যজনক।
সূত্রে জানা যায়,বালু উত্তোলনের ফলে ভাঙছে নদী, আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী বাসিন্দারা। ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার সুগন্ধা ও বিষখালি নদী থেকে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে রাতের আঁধারে অব্যাহতভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে।
কমপক্ষে ৫ টি লোড ড্রেজার (১২ ইঞ্চি) দিয়ে রায়াপুর- সুজাবাদ, অনুরাগ,গৌরিপাশা গ্ৰাম সংলগ্ন সুগন্ধা নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন চলছে। রাত ১০টা থেকে ভোর রাত ৪টা পর্যন্ত চলে এই বালু উত্তোলন। ফলে এই এলাকায় নদী ভাঙন তীব্র হচ্ছে। নদীতে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লক্ষাধিক সিএফটি বালু তুলে তা প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায়। পূর্বে আওয়ামী লীগের আমলে বরিশালের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের কিছু নেতাকর্মী, আমিরাবাদের শাহীন চেয়ারম্যান এবং থানা পুলিশের যোগসাজশে নলছিটির সীমানায় ড্রেজারগুলো দিয়ে বালু উত্তোলন করা হতো। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরে পরিবর্তনের পর এখন পুরো প্রক্রিয়াটির নিয়ন্ত্রন নিয়েছে নলছিটি উপজেলা ও মগড় ইউনিয়নের কতিপয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। গত কয়েকদিন ধরেই প্রকাশ্যে চলছে বালু উত্তোলন। এজন্য প্রতিদিন ড্রেজার প্রতি তোলা হচ্ছে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।পূর্বে আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে একাধিকবার ড্রেজারগুলো আটক করে স্থানীয়রা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করে। ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানও পরিচালিত হয়। এতকিছুর পরেও প্রতিকার মিলছে না। এভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে নদীর উভয় পাড়ে ব্যাপক ভাঙন দেখা দেবে যা স্থানীয়দের জন্য বড় ধরণের হুমকী।
বর্তমানে স্থানীয় বিএনপির কতিপয় নেতা সহ বেশ কিছু প্রভাবশালীদের সাজানো এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে চাইলেও স্থানীয়রা কিছুই করতে পারছে না।
এসকল ড্রেজারের মালিকরা হলেন : কালিজিরা পাথর খোলা এলাকার লিটন খান, দপদপিয়া এলাকার রুবেল, সাইফুল ও সিফাত, কালিজিরার ছোট রুম্মান এবং শুভ। এদের মধ্যে কেউ মালিক কেউ আবার ভাড়া ড্রেজার পরিচালনা করে। প্রতিটি ড্রেজার ১২ ইঞ্চি তথা বড় মাপের। এরা ড্রেজার প্রতি প্রতিদিন ৩-৫ হাজার টাকা চাঁদা দেয় ২৬ নম্বর ওয়ার্ড ও নলছিটি উপজেলা এবং মগড় ইউনিয়নের বিএনপি নেতাদের। চাঁদার টাকা উত্তোলনের দায়িত্বে রয়েছে প্রত্যেক ওয়ার্ডের নির্ধারিত বিএনপির কর্মিরা। এদের মধ্যে কেউ কেউ বালু বিক্রির সাথেও জড়িত।
নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়,নৌ-পুলিশের ওসি ও উর্ধতন কর্মকর্তা, নলছিটি থানা সহ সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে বালু উত্তোলন হওয়ায় প্রশাসনকে জানিয়েও কোন কাজ হচ্ছেনা বলে অভিযোগ নদী পাড়ের বাসিন্দাদের। টাকা দিলে নির্বিঘেœ চলতে দেয়া হয় ড্রেজারগুলো। কোন অভিযান হলেও তার খবর পৌঁছে যায় আগেভাগে।
দিনের বেলায় সব লোড ড্রেজারগুলো কালিজিরা খাল এর মাথায় ডকে রাখা থাকে। রাত হলেই এরা নেমে পড়ে বালু উত্তোলনে। আর চলে সারারাত। প্রতিদিন একটি ড্রেজার ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার সিএফটি বালু উত্তোলন করে।
কালিজিরা এলাকার বাসিন্দা সাবেক কমিশনার হুমায়ন কবিরের খালাতো ভাই পলাশ হাওলাদার, সাইফুল, লিটন খান, দপদপিয়ার রুবেল তাদের মালিকানাধীন বিভিন্ন মাপের বাল্ক হেডের মাধ্যমে এই বালু নগরীসহ আশেপাশের এলাকায় জমি ভরাটের জন্য বিক্রি করেন। ড্রেজারের শক্তিশালী ইঞ্জিনের শব্দে বসতবাড়িতে মানুষ শান্তিতে ঘুমাতেও পারেন না।
এ বিষয়ে বরিশাল সদর থানা নৌ-পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সনাতন সরকার বলেন, তিনি সদ্য এই থানায় এসেছেন। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সঠিক নয়। পূর্বে কেউ এ বিষয়ে জড়িত ছিল কিনা তা জানা নেই। তবে বর্তমানে তারা নদীর এমন লুট কোনভাবেই মানবেন না।
এব্যাপারে নলছিটি ইউএনও নজরুল ইসলাম বলেন, ‘নদী থেকে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার কোনো সুযোগ নেই আমরা শিগগিরই বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেব।’ চলবে
সংবাদটি পঠিত হয়েছেঃ ২৫৭