
বিশেষ প্রতিবেদক ::: ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের খোলস পাল্টে হঠাৎ করে বিএনপির ক্যাডার হিসেবে আবির্ভাব রাজিব হোসেন সাগর ওরফে ইয়াবা সাগরের ভাগ্য যেন আলাদিনের চেরাগের ন্যায় দেখা দিলো। একদিকে জমজমাট মাদক ব্যবসা অন্যদিকে হরিজন কলোনীসহ একের পর এক বাণিজ্যিক স্পট দখল করে হতিয়ে নিচ্ছিল টাকার থলি। মাত্র ২৮ বছর বয়সী এই তরুণ একজন রাজনৈতিক নেতার ছত্র-ছায়ায় এতটাই বেপরোয়া হয়ে ওঠে যে, থানা পুলিশকেও থোরাই কেয়ার করেনি। উপরন্ত থানার ওসি অভিযোগ পেলে চায়ের আমন্ত্রণে ডেকে নিয়ে বৈঠকী আলাপি বসার নানা উদাহরণ ও প্রমাণ রয়েছে। যে কারনে কাউনিয়া থানার বেশ কয়েকজন মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা টেঙ্কি সাগরকে সমিহ করাসহ তার বাসায় যাতায়াত করতে দেখা যায়। প্রশাসনিক এমন আসকারা আর রাজনৈতিক দলের নির্লিপ্ততার কারণে এই যুবক হয়ে ওঠে এক মূর্তিমান আতঙ্ক।
কিন্তু কথায় বলে এক মাঘে শীত যায় না, সময় ফুরিয়ে আসতে বড় কোন ঘটনাও লাগে না। ঘটেছেও তাই। সেই টেঙ্কি সাগরের বিরুদ্ধে অনেকটা নাটকীয় কায়দায় ফুঁসে উঠেছে এলাকার তরুণ সমাজ। তার অপকর্ম বিশেষ করে হরিজন কলোনীতে প্রভাব বিস্তার ও টেম্পো স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজীর চেষ্টার প্রতিবাদে গত সোমবার প্রতিরোধ গড়ে তুললে পাল্টা প্রতিরোধ করার কৌশল নিলে কাউনিয়া প্রধান সড়ক রণক্ষেত্র পরিণত হয়। পরন্ত বিকেলে টেঙ্কি সাগর ৩০/৩৫ জনের একদল সহকর্মী নিয়ে রামদা হাতে মহড়া এবং প্রতিবাদকারী যুবক শুভসহ তার সমর্থিতদের উপর হামলার চালায় এবং শুভকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে। অদম্য শুভ আম জনতাকে সাথে নিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলে সাগরসহ দুই সহযোগী মনির ও রেজাউলকে উত্তম মাধ্যম দেয়। অপররা পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু এর পরের কাহিনী আরো নাটকীয়। অল্প শিক্ষায় শিক্ষিত হলে যে ভয়ঙ্গর হয়, সেই কথার প্রতিফলন হিসেবে সাগর নিজের ঘর নিজেই ভেঙ্গে ২নং ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক পিচ্চি সুমনকে এই হামলার জন্য দায়ী করে এবং তার বাসা থেকে ৮০ হাজার টাকাসহ স্বর্ণালকার লুটতরাজ করার অভিযোগ তোলে। পিচ্চি সুমন ও শুভ এক কাতারে সামিল হওয়ায় এই দুই জনকে ফাঁসাতে এই নাটক সাজানো হয় বলে এলাকায় একথা চাউর হয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পিচ্চি সুমনের সাথে সাপে নেউলে সম্পর্ক ওয়ার্ড বিএনপির জনৈক এক শীর্ষ নেতা পরিস্থিতির সুযোগে সাগরের পক্ষ নিয়ে থানা পুলিশকে ডেকে আনার কিছু আগেই কাউনিয়া পানির টেঙ্কির নিচে সাগরের বাসা ভাঙচুর নাটক সাজানো হয়। যে ৪ মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা টেঙ্কি সাগরের বাসা পরিদর্শনে আসে তারা সকলেই ওই বিএনপি নেতার অনুগত বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া এদের নেতৃত্বদানকারী একজন এসআই সাগরের ‘জানের জান’ বলে অন্তত কাউনিয়ায় পরিচিত। অথচ শুভসহ যে কয়েকজনের বাড়িতে সাগর বাহিনী হামলা চালায় সে সমস্ত স্পট আমলে নেয়নি পুলিশ। উপরন্ত পুলিশ ও রাজনৈতিক ওই নেতা সাগর বাহিনীর আহতদেরকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে মেডিকেলে পাঠিয়ে কিভাবে সুমন-সুভর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা যায় তার একটি পরিকল্পনা বাতলে দিয়ে সেই পথে অগ্রসর হতে থাকে।
রাতের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে এ খবর ফাঁস হয়ে গেলে সুমন-শুভর সমর্থিতরা থানার সমনে অবস্থান নেয় এবং বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা ওসিকে এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার জন্য সতর্কবার্তা দিয়ে আসে। পুলিশও পড়ে যায় বিপাকে। পাল্টা-পাল্টি অভিযোগ মামলাকারে রূপ না দিয়ে উভয় পক্ষকে আদালতে স্বরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে নিজের দায় এড়িয়ে যায়। অথচ পুলিশ এই ঘটনার আদ্য পান্তর নেপথ্যের সত্যতা জানা সত্বেও গত তিন দিনেও সাগর বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনরূপ অভিযান পরিচালনা না করায় সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে অনুমেয়। এই অবস্থায় শুভ বরিশাল জুডিশিয়াল আদালতে গত মঙ্গলবার সাগরকে মূল আসামী করে দুটি মামলা দায়ের করে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। পক্ষান্তরে শুভর আইনী পদক্ষেপে সাগরও একই আদালতে অনুরূপ একটি মামলা করে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তিকে সেল ফোনে শাসানোসহ নানামূখী হুমকী-ধামকী দিয়ে নূতন করে এলাকায় আতঙ্ক তৈরী করেছে।

এ অবস্থার প্রেক্ষাপটে নির্দলীয়ভাবে এলাকাবাসী আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে টেঙ্কি সাগরের লাগাম টেনে ধরার দাবীতে বরিশাল টাউন হল সম্মুক্ষে মানবপ্রাচীর গড়ে তুলে। এই মানববন্ধন পূর্ব কর্মসূচী অনুযায়ী কাউনিয়া প্রধান সড়কে হওয়ার কথা থাকায় বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোক সমাগম হলেও স্থান পরিবর্তন হওয়ায় অনেকেই কর্মসূচীতে অংশ নিতে পারেনি। অবশ্য টাউন হল সম্মুখে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে প্রায় দুই শতাধিক ব্যক্তির কণ্ঠে একই আওয়াজ শোনা যায় যে, মাদক বিক্রির গড ফাদার টেঙ্কি সাগরসহ তার অনুসারীদের দ্রুত আটক এবং এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় পুলিশ কমিশনারের হস্তক্ষেপ কামনা করে।
অনুসন্ধানে যানা জায়, টেঙ্কি সাগরের বিরুন্ধে অন্তত ৬টি মাদক মামলা রয়েছে। একাধিকবার এই আটকও হয়েছিলো কিন্তু বেশি দিন তাকে কারাগারে থাকতে হয়নি। তার মা এতটাই ধুরন্ধর কিভাবে তার পুত্রকে ছাড়িয়ে আনতে হয় এ ব্যাপারে আইনের ফাঁক-ফোকরের বিষয় নাকি বেশ সিদ্ধিহস্থ। এই নারীর বিরুদ্ধেও মাদক মামলা রয়েছে, গিয়েছে বেশ কয়েকবার কারাগারে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের বিগত ১৬ বছরের শাসনামলে প্রথমে চুপচাপ থাকলেও পরবর্তিতে সাদেক আব্দুল্লাহ বরিশাল নগর আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ হাতে পাওয়ার পাশাপাশি সিটি মেয়রের পদে পদে বসার পরই এক সময় জেলা বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত সাগর অকেটা অঘোষিতভাবে দল পরিবর্তন করে ক্ষমতাসীন দলের ছায়াতলে থেকে মাদক ব্যবসা রমরমা রূপ দেয়। এ ক্ষেত্রে সাদিক আব্দুল্লাহর অনুসারী ছাত্রলীগ নেতা রইজ মান্না পরোক্ষভাবে শেল্টার দেয় বলে বিষয়টি ছিলো ওপেন সিক্রেট।

কিন্তু মাদক ব্যবসায়ীরা যে, ক্ষমতার ছায়াতলে থাকতে পছন্দ করে তার প্রমাণস্বরূপ টেঙ্কি সাগর মান্নার সঙ্গ ত্যাগ করে নূতন মেয়র খায়ের আব্দুল্লাহর রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে তার প্রধান সেনাপতি ছাত্রলীগ নেতা অসীম দেওয়ানের বহরে মিলেমিশে মদকের নূতন সিন্ডিকেট তৈরী করে। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো সিটি কর্পোরেশন নিয়ন্ত্রিত কাউনিয়া পানির টেঙ্কির নিচের জায়গা দখল করে সেখানে অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করে বসত বাড়ির অন্তরালে মাদকের আস্থানা গড়ে তোলো। বাবা সিটি কর্পোরেশনের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে চাকরী করার সুবাদে পুত্র সাগর এই দফতরের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলে। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে সিটি কর্পোরেশন নিয়ন্ত্রিত কাউনিয়া হরিজন কলোনীতে প্রভাব বিস্তার করে ৫টি ফাঁকা রুম দখল নিয়ে তা বরাদ্দ দেয়ার নামে এপযন্ত ৮ লক্ষ টাকা নিয়েছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে এ তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। ঘটনা যে সত্য তা সিটি কর্পোরেশনের কাগজপত্র ঘাটলেই প্রমাণ মিলবে বলে জানিয়েছে এই দফতরের সংশ্লিষ্ট শাখার একাধিক কর্মচারী। এ ঘটনা ঘটেছে ৫ আগষ্টের পর পরই।
একাধিক অনুসন্ধানী সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায় ঘটার সাথে সাথে সাগর পাল্টে ফেলে রাজনৈতিক খোলস। হয়ে যায় জেলা বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা এবং সেই পরিচয় বিভিন্ন স্থানে সেটে দেয় তারেক জিয়ার ছবিসহ বিলবোর্ড। এরপরই ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে শুরু করে দখল বাণিজ্য। সেই বাণিজ্য করতে গিয়ে হরিজন কলোনীতে নিজের নিজের রাজত্ব রাজত্ব প্রতিষ্ঠার পর দখল বাণিজ্য করতে দিয়ে এলাকার প্রভাবশালীদের সাথে টক্কর দিতে শুরু করে। পিছনে থেকে এই যুবককে জেলা বিএনপির এক নেতা সেল্টার দিলেও সর্বশেষ সেখান থেকে বিতারীত হয়ে ওয়ার্ড বিএনপির এক নেতার ছায়াতলে যাওয়ার পর ভাগ্যের চাকা উল্টো ঘুরতে ঘুরতে সংঘাত সংঘর্ষে টেঙ্কি সাগরের নাম চারিদিকে ছড়িয়ে পরার পাশাপাশি বেরিয়ে আসছে তার দল বদল আর অপকর্মের সিনেমেটিক কাহিনী।
সংবাদটি পঠিত হয়েছেঃ ২০৮