
নিজস্ব প্রতিবেদক // বরিশাল নগরীর সাবেক কোর্ট ইন্সপেক্টর ও বর্তমানে পুলিশ লাইন্সে কর্মরত মো. নওশের হাওলাদারের বিরুদ্ধে জমি দখল, পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ, জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন এবং মাছের ঘেরে ভবনের বর্জ্য ফেলে মাছ নিধনের অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) পুলিশ কমিশনার ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নওশের হাওলাদার দীর্ঘদিন ধরে বরিশালেই চাকরি ও বসবাস করে আসছেন।
চাকরি জীবনে তিনি মূলত কোর্ট ইন্সপেক্টর ও পুলিশ লাইন্সে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন। তাদের ভাষ্য, কর্মজীবনে তার বরিশালের বাইরে বদলি বা দায়িত্ব পালনের নজির খুবই কম, কিংবা নেই বললেই চলে।
ফলে একজন পুলিশ কর্মকর্তার দীর্ঘ চাকরি জীবনে একই জেলার মধ্যে বারবার দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বের পরিবর্তন হলেও নওশের হাওলাদারকে আবারও বরিশালেই পদায়ন করা হয়েছে।
এ কারণে তার চাকরি জীবনের বদলি, পদায়ন ও কর্মস্থলের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড যাচাই করে দেখা প্রয়োজন—তিনি আদৌ কতবার বরিশালের বাইরে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বরিশালে তার দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানের পেছনে কোনো বিশেষ প্রভাব বা সুপারিশ কাজ করেছে কি না।
তবে এ বিষয়ে কোনো প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততার স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা যাচাই করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি পর্যালোচনা করলেই বিষয়টির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
অভিযোগে বলা হয়, নগরীর নবগ্রাম রোডের নুরুল ইসলাম কাউন্সিলরের হাউজিং এলাকায় প্রায় ৬ শতাংশ জমিতে পাঁচতলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে ছয়তলা ভবন নির্মাণ করেন তিনি ভবনটি নওশেরের স্ত্রী মুন্নি বেগমের নামে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভবনটির অনুমোদিত নকশা ও বাস্তব নির্মাণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। এ ছাড়া পাশের খলিলুর রহমানের প্রায় ৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধে নওশেরের আত্মীয় পরিচয়ে মামুন নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে দলিল ও বিএস পর্চা সংক্রান্ত কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মূল দলিলে ৫৫৯ নম্বর দাগ থাকলেও ওভাররাইটিং করে তা ৫৫৬ করা হয়।
পরে বিষয়টি নিয়ে সেটেলমেন্ট অফিসে মামলা হলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাইয়ের পর খলিলুর রহমানের পক্ষে সিদ্ধান্ত আসে বলে অভিযোগকারীরা জানান। খলিলুর রহমানের কাছ থেকে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ জমি বায়না করা নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, ওই জমিতে কাজ করতে গেলে পুলিশ দিয়ে বাধা দেওয়া হয়।
এবং কথিত বিএনপি নেতা এ.বি.এম মহসিন খান বাশারকে ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ওপর জোড় জুলুম করে যাচ্ছে। এ বিষয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করা হলেও অদৃশ্য কারণে বাসার ও নওশের রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অপরদিকে দুদকে দেওয়া অভিযোগে নওশেরের বিরুদ্ধে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকার সম্পদ গড়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে নবগ্রাম রোডে ভবন, কাইন্দারকাঠীতে জমি ও দোতলা ভবন, ঝালকাঠীতে ১০ শতাংশ জমি এবং বানারীপাড়ার বাইশারী এলাকায় জমির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নিজ, স্ত্রী ও আত্মীয়দের নামে আরও সম্পদ থাকার দাবি করে এসব সম্পদের বৈধ উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে। তবে অভিযোগে উল্লেখিত সম্পদের মালিকানা, বর্তমান বাজারমূল্য, প্রকৃত মালিকানা এবং অর্থের উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, আয়কর বিবরণী, জমির দলিল এবং সম্পদ অর্জনের আর্থিক উৎস তদন্ত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে নবগ্রাম রোডের খান সড়ক এলাকায় মাছের ঘেরে নওশেরের বহুতল ভবনের সেফটি ট্যাংকের বর্জ্য ফেলে মাছের পোনা নিধনের অভিযোগ করেছেন এক ব্যবসায়। তার দাবি, গত ১০ আগস্ট বর্জ্য ফেলার পর ঘেরের মাছ মারা গিয়ে লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিবাদ করলে তাকে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় কোতয়ালী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. নওশের হাওলাদারের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
তার বাসায় গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, নওশের হাওলাদারের চাকরি জীবনের পূর্ণাঙ্গ বদলি ও পদায়ন ইতিহাস, জমির দলিল ও সেটেলমেন্ট মামলার নথি, ভবনের অনুমোদিত নকশা, আয়কর নথি এবং কথিত সম্পদের বৈধ উৎস যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক।
একজন পুলিশ কর্মকর্তার দীর্ঘ কর্মজীবনে একই জেলার নির্দিষ্ট কয়েকটি ইউনিটে—বিশেষ করে কোর্ট ও পুলিশ লাইন্সে—দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
তাদের প্রশ্ন, নিয়মিত বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে তার কর্মস্থল বরিশালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার পেছনে কোনো প্রশাসনিক কারণ রয়েছে কি না, নাকি বিশেষ কোনো প্রভাব কাজ করেছে।
অন্যদিকে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, সম্পদের মালিকানা, ভবন নির্মাণ এবং চাকরি জীবনের পদায়ন—সবকিছুর নথিপত্র যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত হলেই অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংবাদটি পঠিত হয়েছেঃ ৪