
রিপন রানা,বরিশাল:: বরিশাল নদী বন্দর (লঞ্চঘাট) এলাকায় সক্রিয় রয়েছে একটি সুসংগঠিত ‘রোগী ধরা’ দালাল চক্র।
অটোরিকশা চালক ও ছদ্মবেশী দালালের সমন্বয়ে গঠিত এই সিন্ডিকেটটি ভোলা, মেহেন্দিগঞ্জ, হিজলা ও পটুয়াখালীসহ উপকূলীয় বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা সরল-সোজা রোগীদের টার্গেট করে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করে আসছে। সরকারি হাসপাতাল বা নামকরা চিকিৎসকদের চেম্বারে যাওয়ার পথে রোগীদের ফুসলিয়ে নিম্নমানের ও লাইসেন্সবিহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্রটি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন ভোরে যখন দূর-দূরান্ত থেকে রোগীবাহী লঞ্চগুলো ঘাটে এসে পৌঁছায়, তখন সাধারণ যাত্রী ও রোগীদের ঘিরে ধরে কিছু অটোরিকশা চালক ও দালাল। রোগী ও তাদের স্বজনরা কোন চিকিৎসকের কাছে যাবেন তা জানার পর শুরু হয় চক্রটির প্রতারণার খেলা।
তারা রোগীদের বিভ্রান্ত করতে শুরু করে, “আপনি যে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন তিনি আজ চেম্বারে বসেননি” কিংবা “শের-ই-বাংলা মেডিকেলে এখন চিকিৎসা ভালো হয় না, ডাক্তাররা কর্মবিরতিতে আছেন।” এর পরিবর্তে তারা কম খরচে ভালো চিকিৎসা এবং নামকরা প্রফেসরের প্রলোভন দেখিয়ে রোগীদের নিজস্ব সিন্ডিকেটের অটোরিকশায় তোলে। পরবর্তীতে শহরের নির্দিষ্ট কিছু নামসর্বস্ব ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব ভুয়া ও অনুমোদনহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীদের নিয়ে যাওয়ার বিনিময়ে অটোরিকশা চালক ও দালালরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মোট খরচের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন পেয়ে থাকে। কমিশনের লোভে তারা রোগীদের অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত টেস্ট করাতে বাধ্য করে এবং অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের হাতে চিকিৎসকের জাল বা ভুয়া রিপোর্ট ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এতে একদিকে রোগীরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, অন্যদিকে ভুল রিপোর্টে ভুল চিকিৎসার কারণে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
প্রশাসনের চোখ এড়াতে সপ্তাহের ৪ দিন বেপরোয়া দালালরা: এদিকে এই চক্রের কার্যক্রমের সময়সূচী নিয়ে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক যুবক জানান, “রোগীর দালালরা মূলত প্রশাসনের সাপ্তাহিক অভিযান ও আটকের ভয়ে বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার তেমন একটা কাজ করে না। কারণ এই দিনগুলোতে সরকারি ছুটির আমেজ থাকে। ফলে নিজেদের সুবিধার্থে ও নির্বিঘ্নে প্রতারণা চালাতে তারা রবিবার, সোমবার, মঙ্গলবার ও বুধবার পুরো দমে মাঠে নামে।” প্রশাসনের নজরদারির এই ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়ে সপ্তাহের এই চার দিন তারা চরম বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
এই চক্রের বিরুদ্ধে বরিশাল জেলা প্রশাসন, র্যাব-৮ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বেশ কয়েকটি মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে। অভিযানে বেশ কয়েকজন দালাল ও ক্লিনিক ম্যানেজারকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়েছে। একই সাথে সিলগালা করা হয়েছে কয়েকটি অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টার।
তবে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, প্রশাসনের এই অভিযান নিয়মিত না হওয়ায় সুযোগ পেলেই আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে চক্রটি। রোগীদের সুরক্ষায় লঞ্চঘাট ও হাসপাতালের আশপাশের এলাকায় শুধু ছুটির দিন নয়, সপ্তাহের ৭ দিনই স্থায়ী পুলিশি নজরদারি এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা টহল বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
এবিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা জানান, দালালের খপ্পরে পড়ে সাধারণ রোগীদের প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। স্বাস্থ্য বিভাগ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কোনো ধরনের বাণিজ্য সহ্য করবে না।তিনি আরও বলেন, “লঞ্চঘাট ও হাসপাতালের আশপাশের এই চক্রটির ওপর আমাদের কড়া নজরদারি রয়েছে। ইতোমধ্যেই জেলা প্রশাসন ও র্যাব-৮ এর সহযোগিতায় বেশ কয়েকটি অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিককে জরিমানা ও সিলগালা করা হয়েছে। নামসর্বস্ব যেসব প্রতিষ্ঠান দালালের মাধ্যমে রোগী এনে পরীক্ষা করায়, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তবে সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে এবং যেকোনো প্রতারণার শিকার হলে সাথে সাথে প্রশাসনকে জানাতে হবে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) কোতয়ালী মডেল থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার জনাব অলক কান্তি শর্মা বলেন,লঞ্চঘাট ও তার আশপাশের এলাকায় অটোরিকশা চালক ও দালালদের এই সিন্ডিকেটের ব্যাপারে আমাদের কাছেও অভিযোগ এসেছে। সাধারণ রোগীদের এভাবে হয়রানি ও প্রতারণা করা একটি ফৌজদারি অপরাধ।
তিনি আরও বলেন, “প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে তারা সপ্তাহের কোন দিন বেশি সক্রিয় থাকে, সেই গতিবিধির ওপরও এখন আমরা কড়া নজর রাখছি। লঞ্চঘাট ফাঁড়ি পুলিশসহ কোতয়ালী মডেল থানার সাদা পোশাকের টিমকে এই চক্রটি দমনে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রবি থেকে বুধ—যেকোনো দিনই হোক না কেন, ছদ্মবেশী এসব দালাল ও প্রতারক অটোচালকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। রোগীদের সুরক্ষায় আমাদের এই চিরুনি অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সংবাদটি পঠিত হয়েছেঃ ৫৪